মোঃ নুরুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি ।।
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে শালিসের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং তার পাল্টা অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ‘রোদার পুড্ডা আলোকিত প্রজন্ম’ নামের একটি সংগঠনের সামাজিক ও মাদকবিরোধী কার্যক্রম, জরিমানা আদায় এবং তার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করেই মূলত এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ এবং স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে গ্রামবাসী।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে সংক্ষুব্ধরা নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা, নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ ইশতিয়াক আহমেদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু এবং সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিমের হাতে এই স্মারকলিপি তুলে দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধ ও সামাজিক পরিবেশ সুন্দর রাখতে কাজ করে আসছিল ‘রোদার পুড্ডা আলোকিত প্রজন্ম’। সংগঠনের নেতাদের দাবি, তাদের মাদকবিরোধী সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের ফলে এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমেছে। তবে তাদের সালিশি বৈঠক ও জরিমানা আদায়ের নিয়ম এবং কাজের ধরন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে সংগঠনের সভাপতি আরিফ রাব্বানী বলেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে মাদক সেবনের খবর পেয়ে সংগঠনের সদস্যরা একটি জায়গায় যান। সেখানে কয়েকজনকে একসাথে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষের সদস্যরা গালিগালাজ ও মারমুখী আচরণ শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও প্রতিপক্ষ তাতে সাড়া দেয়নি।
আরিফ রাব্বানী আরও দাবি করেন, সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় বানোয়াট অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে সালিশের নামে আইনি ভিত্তি ছাড়া জরিমানা আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সরাসরি উত্তর দেননি।
অন্যদিকে, সংগঠনটির বিরুদ্ধে বাড়ি ঢুকে হেনস্তা ও শালিসের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছেন স্থানীয় আলম মেম্বার। তিনি মুঠোফোনে জানান, সংগঠনটি এ পর্যন্ত ১৯ জনের কাছ থেকে শালিসের নামে বেআইনিভাবে জরিমানা আদায় করেছে। বিচার প্রক্রিয়ার নামে মানুষকে কান ধরে উঠবস করানো ও জুতার বাড়ি দেওয়ার মতো অপমানজনক ঘটনাও ঘটেছে।
আলম মেম্বার অভিযোগ করেন, “ঘটনার সময় আমি হাওরে ছিলাম। সন্ধ্যার পর আমার ছেলে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন সংগঠনের লোকজন এসে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, তারা আমার অজান্তে বাড়িতে ঢুকে ছেলে-মেয়ের ছবি তোলে, যা আমাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে।” তিনি জানান, বাড়িঘরে হামলার আশঙ্কায় পরবর্তীতে তিনি থানায় আশ্রয় নিয়ে লিখিত এজাহার জমা দেন এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
তবে আলম মেম্বারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবনের যে পাল্টা অভিযোগ আনা হয়েছে, তার পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ বা আইনি প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম বলেন, সমাজকে মাদকমুক্ত করতে হলে মাদকসেবী ও কারাবাজদের প্রতিহত করতেই হবে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন:
উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম বলেন, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন, তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ‘মব’ সৃষ্টিতে রূপ না নেয়। অপরাধী যে-ই হোক, প্রচলিত আইনেই তার বিচার হবে।”
উপজেলা বিএনপি সভাপতি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ মাদক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কারো কাছে তথ্য থাকলে তা গোপনে প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
নিকলী থানা ওসি মোঃ ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, “মাদক নির্মূলে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, “প্রাপ্ত স্মারকলিপিটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
একপক্ষ মাদকবিরোধী আন্দোলনের নামে জরিমানা ও হয়রানির অভিযোগ তুলছে, অন্যপক্ষ পাল্টা অভিযোগ দিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত রাখছে। ফলে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ আইনি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন এলাকার সাধারণ মানুষ।




